মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

প্রাকৃতিক সম্পদ

 প্রাকৃতিক সম্পদ

পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও গ্রামের বুদবুদি ছড়া থেকে অব্যাহত গ্যাস বের হচ্ছে। এ গ্যাস নিঃসরণের সময় প্রায় এক শতাব্দিরও বেশি। ১৯৫১ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বুদবুদি ছড়া থেকে গ্যাস উত্তোলনে উদ্দ্যোগ নেয়। বার্মা (মিয়ানমার) অয়েল কোম্পানি গ্যাস ফিল্ড আবিস্কার করে, গ্যাস উত্তোলনের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৫৩ সালে হঠাৎ বার্মা অয়েল কোম্পানি গ্যাস খনির নাভিপথে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সিসা ঢালাই করে দেয়। সে থেকে এখনও বন্ধ রয়েছে গ্যাস ফিল্ডটি ও গ্যাস উত্তোলন। এ থেকে শত বছর ধরে উধাও হয়ে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকার গ্যাস। মাটির নীচ থেকে গ্যাস বের হয়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। ফুরিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের বিশাল মজুদ।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও গ্রামের দূর্গম পাহাড়ি এলাকা বুদবুদি ছড়া নামক স্থানে এ গ্যাস ফিল্ডটির অবস্থান। পটিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার পূর্ব পাশে ফিল্ডটি অবস্থিত। এ ফিল্ড লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাটির নীচ থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। গ্যাসফিল্ড স্থাপনের দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে নিঃশেষ হচ্ছে হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক গ্যাস।

সরেজমিন বুদবুদি ছড়ায় গিয়ে দেখা যায়,পরিত্যক্ত গ্যাস কুপে এখনও অনবরত জ্বলছে আগুন। বুদবুদি ছড়ার শ্রীমাই খাল ও আশপাশের এলাকায় মাঝে মাঝে কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় প্রায় উভয় পাশে দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাহাড় ফুটো হয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। শ্রীমাই খালের প্রায় জায়গায় পানিতে বুদবুদ দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। এছাড়া এ এলাকায় মাটির কয়েক ফুট গভীরে বাঁশ বা নল ঢুকিয়ে দিয়ে তার মাথায় দিয়াশলাইয়ের কাটি দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিলে তা জ্বলছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৫১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রথম বারের মত বার্মা অয়েল কোম্পানিকে (বিওসি) বুদবুদি ছড়ার এ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য নিয়োগ করেন। তারা অনুসন্ধান করে বিশাল গ্যাসের মজুদ আছে বলে রিপোর্ট দেন। সেখানে গ্যাস কূপ খনন করেন। গ্যাস উত্তোলনের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করেন। পটিয়া সদর থেকে বুদবুদি ছড়াপর্যন্ত একটি সড়ক (যা বর্তমান বিওসি রোড হিসেবে পরিচিত), গ্যাসফিল্ড এলাকায় হেলিপ্যাড, সুইমিংপুল ও বাসস্থান গড়ে তোলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বহির্বিশ্বের কয়েকটি দেশের ষড়যন্ত্রমূলক চক্রান্তের কারণে উল্লেখিত কোম্পানি সাফল্যের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৫৩ সালে এ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন মুখে সীসা ঢালাই করে দেয়। এরপর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বার্মা অয়েল কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এরপর তৎকালীন সরকার নিজস্ব উদ্যেগে বুদবুদি ছড়া এলাকার প্রায় সাড়ে তিনশত একর জমিতে প্রাকৃতিক সম্পদ তেল ও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে পারদর্শী একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়। তারা দীর্ঘ আট মাস ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ওই সংস্থা তাদের রিপোর্টে জানান, সেখানে প্রচুর পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। সোভিয়েত সংস্থার প্রাপ্ত অনুসন্ধানী রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার বুদবুদি ছড়ার মাটির গভীরের তরল পদার্থের নমুনা পুনঃপরীক্ষার জন্য পাশ্ববর্তী ভারতের আসাম রাজ্যে পাঠায়। তারা দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বুদবুদি ছড়ায় প্রচুর পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা দেন।

১৯৯৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিদেশী তেল গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস ও তেল পাওয়ার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়। তাছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ মিনারেল ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ গ্যাস এন্ড অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের পৃথক বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের আমলে ওই এলাকার খনিজ সম্পদের ওপর অনুসন্ধান চালায়।  তারাও সেখানে গ্যাস ও তেল পাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান। কিন্তু কোন সরকারই পাকিস্তান আমলে ঢালাইকৃত সীসা কুপকে পাশ কাটিয়ে গ্যাস উত্তোলনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

এদিকে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পটিয়া বুদবুদি ছড়ার তেল-গ্যাস উত্তোলনের প্রাথমিক জরিপের কাজ পুনরায় শুরু করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোং লিঃ (বাপেক্স)। তাদের ভূ-তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ দল বুদবুদিছড়ার তেল-গ্যাস প্রাপ্তির আশায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া রাজারহাট কর্ণফুলী থেকে পটিয়ার হাইদগাঁও বুদবুদি ছড়া পর্যন্ত বিশাল এলাকা নিয়ে জরিপ কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ করেছে। তবে এ ব্যাপারে বাপেক্সের কয়েকজন সিনিয়র অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তারা কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে সাঙ্গু গ্যাস ফিল্ডের রিজার্ভ নিম্নপর্যায়ে চলে যাওয়ায় গ্যাসনির্ভর চট্টগ্রামের ১২শ' শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারের নোটিশ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস নির্ভর রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিভিন্ন ইউনিট প্রায় সময় বন্ধ হয়ে যায়। শিকলবাহা পিকিং বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে উদ্ভোধনের দিন থেকে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদনে যেতে পারছেনা গ্যাসের অভাবে। এ পরিস্থিতিতিতে বর্তমানে চট্টগ্রামে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২৩০-২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামে সবসময়ই গ্যাসের সংকট বিরাজমান। এ সংকট নিরসনে বুদবুদি ছড়ার গ্যাস উত্তোলনে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। বিজ্ঞ মহলের ধারণা, বুদবুদি ছড়ার গ্যাস উত্তোলন করা হলে চট্টগ্রামসহ সারাদেশের গ্যাসের সংকট অকেটা নিরসন করা সম্ভব হবে।

ছবি


সংযুক্তি



Share with :

Facebook Twitter